পোশাক শিল্পের আড়ালে বছরে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার
Published : Tuesday, 23 February, 2021 at 12:00 AM, Update: 22.02.2021 10:06:13 PM
পোশাক শিল্পের আড়ালে বছরে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচারদিনকাল রিপোর্ট
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের বিরুদ্ধে আমদানি ও রফতানির আড়ালে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচারের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার দুদক সচিব ড. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার জানান, কিছু সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তার সহযোগিতায় তারা এই অর্থপাচার করেছেন বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দুদক সচিব বলেন, বর্তমানে দুদকের একটি অনুসন্ধান টিম এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একইসঙ্গে আল মুসলিম গ্রুপের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রফতানির আড়ালে ১৭৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের একটি অভিযোগেরও অনুসন্ধান করছে দুদক। ড. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, অনুসন্ধান টিম কর্তৃক প্রতিবেদন দাখিল করা হলে তা পর্যালোচনা করে কমিশন আইন মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সম্প্রতি দুদকের চাহিদার ভিত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ওভার ইনভয়েসিং সংক্রান্ত কিছু তথ্য পাঠায়, যার ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধান টিম গঠন করে। তিনি বলেন, কতিপয় গার্মেন্টস মালিকদের বিরুদ্ধে কিছু পাবলিক সার্ভেন্টের সহযোগিতায় অবৈধ সম্পদ অর্জনপূর্বক আমদানি ও রপ্তানির আড়ালে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার এবং আল মুসলিম গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রপ্তানীর আড়ালে ১৭৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের একটি অভিযাগ পাওয়ার পর দুদক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে দুদকের একটি অনুসন্ধান টিম অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনুসন্ধান টিম প্রতিবেদন দাখিল করলে তা পর্যালচনা করে কমিশন আইন মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এজন্য তিন সদস্যের একটি টিম কাজ করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ওভার ইনভয়েসিংয়ের অভিযাগে অনুসন্ধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের চাহিদার ভিত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ওভারইনভয়েসিং সংক্রান্ত কিছু তথ্য পাঠায়, যার ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে। বর্তমানে উক্ত টিম অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু ব্যাপক হওয়ায় এ বিষয়ে অনুসন্ধান সম্পন্ন করতে সময়ের প্রয়োজন। দুদক তার চাহিদার প্রেক্ষিতে এনবিআর থেকে তথ্য পেতে শুরু করেছে। আশা করা যায়, এখন থেকে এনবিআর ওভার ইনভয়েসিংয়ের তথ্য পাওয়ামাত্র নিয়মিতভাবে দুদককে তথ্য সরবরাহ করবে। বিদেশে অর্থ পাচার রোধে দুদক অত্যন্ত কঠোর। এলক্ষে দুদক চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, তদন্তযোগ্য তথ্য পাওয়া মাত্র দুদক অর্থ পাচার রোধকল্পে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে দুদক বিএফআইইউ এবং সেন্ট্রাল অথরিটি তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা গ্রহণ করে। সচিব এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, কয়েকজন আইনজীবীর সিইসির বিরুদ্ধে আনিত লিখিত অভিযোগটি যাচাই বাছাই কমিটিতে রয়েছে।

‘তৈরি পোশাকখাতে সুশাসনের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি বিভিন্ন সময়ে উঠে এলেও তা নিরসনে সরকার ও মালিকপক্ষের সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি লক্ষণীয়। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সময়ে এই প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে। তৈরি পোশাকখাতের করোনাভাইরাস উদ্ভূত সংকট: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ১৭ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। তৈরি পোশাকখাতে করোনা উদ্ভূত বর্তমান ও ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ উত্তরণে অংশীজনদের করণীয় চিহ্নিত করে ৯ দফা সুপারিশ প্রস্তাব করেছে টিআইবি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্ট-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ নূরে আলম মিল্টন ও আ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তৈরি পোশাক মালিকপক্ষ ব্যবসার সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিভিন্ন প্রণোদনা আদায় করলেও শ্রমিকদের অধিকার, সুরক্ষা ও নিরাপত্তায় কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ব্যাপক ঘাটতি লক্ষ করা যায়। অপরদিকে করোনা সংকটকালে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানসমূহ শ্রমিক সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া এবং কারখানা মালিকদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি ও নৈতিক ব্যবসা না করার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। তৈরি পোশাকখাতে বর্তমান ও ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ উত্তরণে করণীয় চিহ্নিত করে ৯ দফা সুপারিশ প্রস্তাব করে টিআইবি। তাদের সুপারিশগুলো হলো-
১. করোনা মহামারি বিবেচনায় নিয়ে সকল শ্রেণির শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তার বিধান সংযুক্ত করে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’ এর ধারা ১৬ ও ২০ সংশোধন করতে হবে।
২. বিজিএমইএ কর্তৃক প্রণীত গাইডলাইন মোতাবেক শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন ব্যত্যয় হলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ‘ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি)’ সুবিধা বাতিল এবং জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. বিজিএমইএর অঙ্গীকার করা করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার বাকি তিনটি ল্যাব দ্রুততার সাথে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে স্থাপন করতে হবে।
৪. ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নৈতিক ব্যবসা পরিচালনায় অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে। পোশাকের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ও কার্যাদেশ বিদ্যমান শর্তের সাথে দুর্যোগকালে শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতকরণের বিষয় সংযুক্ত করতে হবে।
৫. করোনার দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকার ও মালিক সংগঠনসমূহ কর্তৃক গঠিত বিভিন্ন কমিটিকে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে এসব কমিটি শ্রমিকদের অধিকার ও কারখানায় তাদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
৬. লে-অফকৃত কারখানায় একবছরের কম কর্মরত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৭. শ্রমিক অধিকার ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিতে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির নিয়মিত ও কার্যকর পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।




৮. ইইউ ও জার্মানির সহায়তা তহবিল ব্যবহারের জন্য করোনা মহামারির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সঠিক তালিকা অবিলম্বে প্রণয়ন করতে হবে।
৯. করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া, শ্রমিক ছাঁটাই, কার্যাদেশ বাতিল ও পুনর্বহাল, প্রণোদনার অর্থের ব্যবহার ও বণ্টন, ইত্যাদি সব তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে ও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।










প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ডিজিটাল অ্যাক্ট একটা জুলুম, মুখ ও লেখা বন্ধের আইন। আপনি কি তাই মনে করেন
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা