আম্পানের আঘতে লণ্ডভণ্ড দক্ষিণাঞ্চল : নিহত ১২
হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত॥ খোলা আকাশের নিচে অর্ধ লক্ষ মানুষ॥ জীবন হানি ও ক্ষয়ক্ষতিতে বিএনপির উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ ॥  ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান
Published : Friday, 22 May, 2020 at 12:00 AM, Update: 21.05.2020 10:06:47 PM
রফিক মৃধা, দিনকাল
আম্পানের আঘতে লণ্ডভণ্ড দক্ষিণাঞ্চল : নিহত ১২সুপার সাইকোন আম্পান সারাদেশের সাত জেলায় ১২ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১২ জন নিহত হয়েছে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়ে। আম্পান কিছুটা তেজ হারিয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় রূপে বুধবার দুপুরের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানে। পরে রাতে এ ঝড় প্রবেশ করে বাংলাদেশে। ঝড়ের মধ্যে প্রবল বাতাসে বহু গাছপালা ভেঙে পড়ে, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন উপকূলের ১০ লাখের বেশি গ্রাহক। দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাসমুহে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এর আঘাতে মানুষের জীবনহানি এবং বসতবাড়ি, গবাদিপশু, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে উপদ্রুত এলাকার অসহায় মানুষের দুর্দশায় উদ্বেগ এবং মানুষের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, গতকাল সুপার সাইকোন আম্ফান বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করার সময় সাতক্ষীরাসহ কয়েকটি এলাকায় ব্যাপক তান্ডব চালিয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলাসমূহে এই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে নদির বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাঁধ ভেঙ্গে পানি সংলগ্ন এলাকার গ্রামগুলোকে ক্রমান্বয়ে তলিয়ে দিচ্ছে। মানুষের প্রাণহানি ছাড়াও হাজার হাজার কাঁচা বাড়িঘর বিধ্বস্ত, সহায়-সম্পত্তি, গাছপালা, চিংড়ী ঘের ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে বিপন্ন মানুষদের প্রতি আমি গভীরভাবে সমব্যাথী। এহেন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুবরণকারীদের পরিবার-পরিজন এবং দুঃখ দুর্দশায় পতিত বেঁচে থাকা মানুষদের সহানুভূতি জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। উপদ্রুত এলাকায় বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য, সুপেয় পানি ও ঔষুধের তীব্র সংকটে মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। এই রকম দুর্যোগময় পরিস্তিতির পূর্বাভাস জেনেও উপকূলীয় এলাকার মানুষসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্তানে সরিয়ে নিতে তেমন কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। একদিকে করোনা ভাইরাসের আঘাতে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে বয়ে চলছে ভীতি আতঙ্কের প্রবাহ। প্রতিনিয়ত করোনায় মৃত্যু ও অসুস্ততা মানুষকে তাড়া করছে, এর ওপর ঘূর্ণিঝড়ের করাল গ্রাসে উপকূলবাসীরা এখন বিপর্যস্ত ও দিশেহারা। ঘূর্ণিঝড় কবলিত এলাকার মানুষের সাহায্যার্থে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। আমি ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত উপকূলীয় মানুষদের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল-বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীসহ দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল-বিএনপি এই ধরনে গুরুতর সংকটে সবসময়ই অসহায় মানুষের পাশে থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ যুগযুগ ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দিয়ে আবারও নতুন উদ্যোমে কাজ শুরু করেছে। এবারেও শত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ঘূর্ণিঝড় কবলিত সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর উপদ্রুত মানুষ সংকট নিরসনে সক্ষম হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। ঘূর্ণিঝড়ে নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং আহতদের আশু সুস্ততা কামনা করছি।
অপর এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গতকাল উপকূলীয় জেলাসমূহ সুপার সাইকোন আম্পানের তীব্র আঘাতে হতাহতের ঘটনাসহ মানুষের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, গাছপালা, গবাদিপশু সব ধ্বংস হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, “উপকূলীয় এলাকা সাতক্ষীরা দিয়ে আসা এই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে বেশ কয়েকটি পয়েন্টের বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বহু চিংড়ী ঘের ও বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে এই দানবীয় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে। এছাড়াও কলা ক্ষেত, পানের বরোজ এবং আমসহ ফসলী ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মানুষের জীবন ও সম্পদ হয়েছে বিপন্ন, প্রাণহানীসহ অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ী হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে। আম্পানের ন্যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলসমূহের জনগণের প্রতি আমি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করছি। বাংলাদেশসহ সারাবিশে^র করোনা ভাইরাসের মহামারিতে দুর্বিষহ জনজীবনের ওপর এই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের অভিঘাত এক ভয়াবহ বিপর্যয়। তবুও আমি দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করি অতীত ঐতিহ্যের ন্যায় উপকূলবর্তী অঞ্চলসমুহের সাহসী মানুষরা তাদের শোক ও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে নবউদ্যোমে জীবন সংগ্রামে বিজয়ী হবে ইনশাল্লাহ। আমি মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা করছি তিনি যেন ক্ষতিগ্রস্ত ও শোকে ম্রিয়মান মানুষকে এই বিশাল শোক ও কষ্ট সইবার ক্ষমতা দান করেন। আমি বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আহবান জানাচ্ছি তারা যেন সকল সামর্থ্য নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। পাশাপাশি সমাজের সচ্ছল ব্যক্তিদেরকেও উপদ্রুত এলাকায় অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানাচ্ছি। আমি ঘূর্ণিঝড়ে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা ও তাদের শোক বিহব্বল পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। ঘূর্ণিঝড়ে আহতদের আশু সুস্ততা কামনা করছি এবং তাদের দ্রুত সুচিকিৎসা নিশ্চিতকরণ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের বাড়ীঘর নির্মাণে অবিলম্বে ব্যবস্তা গ্রহণ করতে সহযোগিতা প্রদানের জন্য আহবান জানাচ্ছি।
পিরোজপুর ও যাশোরে তিনজন করে, পটুয়াখালীতে দুজন এবং ঝিনাইদহে, সাতক্ষীরা, ভোলা ও বরগুনায় একজন করে মারা গেছেন।তাদের বেশিরভাগই ঝড়ে গাছ বা ঘর চাপা পড়ে মারা গেছেন। ঝড়ের মধ্যে বুধবার রাত ১০টার পর যশোরের চৌগাছা উপজেলার চাঁদপুর গ্রামে ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে এক মা ও তার শিশু কন্যার মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন-খ্যান্ত বেগম (৪৫) ও মেয়ে রাবেয়া (১৩)।
এদিকে রাত ১১টার দিকে শার্শায় ঝড়ের মধ্যে গাছ চাপা পড়ে একজনের মুত্যু হয়েছে। উপজেলার বাগআচড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর টেংরা এলাকায় মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম মুক্তার আলি। বয়স৬৫ বছর। আম্পানে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় দুজন এবং ইন্দুরকানী উপজেলায় একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ওই তিনজন হলেন- মঠবাড়িয়া উপজেলার দাউদখালী ইউনিয়নের গিলাবাদ গ্রামের মজিদ মোলার ছেলে শাহজাহান মোলা (৫৫) ও আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের ধুপতি গ্রামে মুজাহার বেপারীর স্ত্রী গোলেনুর বেগম (৭০) এবং ইন্দুরকানী উপজেলার উমিদপুর এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে শাহ আলম (৫০)। ঝিনাইদহে রাতে ঝড়ের মধ্যে ঘরের উপর গাছ ভেঙে পড়ে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। রাত ১০টার পর সদর উপজেলায় হলিধানী গ্রামে একটি গাছ ভেঙে ঘরের ওপর পড়ে নাদিরা বেগমের (৫৫) মৃত্যু হয়। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সাতক্ষীরা সদরে গাছ ভেঙে পড়ে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। তার নাম পরিচয় জানা যায়নি। আম্পানের প্রভাবে পটুয়াখালীতে গাছ পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নৌকাডুবিতে নিখোঁজ ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) এক সদস্যের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গলাচিপা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, বুধবার সন্ধ্যায় গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি এলাকায় ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে ছয় বছরের শিশু রাসেদ নিহত হয়েছে।রাসেদের মাও আহত হন। ভোলার চরফ্যাশনে ঝড়ে গাছ চাপা পড়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার দুপুরে উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার প্রধান সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।তার নাম ছিদ্দিক ফকির। বয়স ৭০। বরগুনার সদর উপজেলার আশ্রয়কেন্দ্র যাওয়ার পথে শহীদুল ইসলাম নামে এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ‘অসুস্ত হয়ে’ মারা গেছেন। হৃদরোগে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
খুলনায় হাজারো ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, খোলা আকাশের নিচে অর্ধলাখ মানুষ : ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবে খুলনার হাজার হাজার কাঁচা ও সেমিপাকা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। খুলনা মহানগরী থেকে শুরু করে কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে প্রায় অর্ধলাখ মানুষের ঠাঁই হয়েছে খোলা আকাশের নিচে। বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে জমির ফসল। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ করছে উপজেলা প্রশাসন। তবে খুলনায় কোনো প্রাণহানির সংবাদ পাওয়া যায়নি।
এদিকে কয়রা উপজেলার বেড়িবাঁধ বুধবার রাতে ভেঙ্গে গেছে। বৃহস্পতিবার সকালের জোয়ারে বাঁধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন। এসব ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের ঘরবাড়ি এখন পানির নিচে। কয়রা উপজেলা সদরও জোয়ারের পানিতে ভাসছে। এখনও বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি সংশিষ্টরা। ঘূর্ণিঝড়ের পরিস্তিতি মনিটরিংয়ে বুধবার রাত থেকেই কয়রা উপজেলার নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অবস্তান করছিলেন স্তানীয় সাংসদ আকতারুজ্জামান বাবু। বৃহস্পতিবার সকালে ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে তিনি জানান, ৬টি স্তানে বাঁধ ভেঙ্গে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নদির পানিতে তলিয়ে আছে। গ্রামের পর গ্রাম লোনা পানিতে ভাসছে। দ্রুত ভাঙ্গা বাঁধ মেরামত করা না গেলে এ লোনা পানিই দির্ঘস্তায়ী বিপদ ডেকে আনবে।
তিনি বলেন, শতশত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত। হাজার হাজার গাছ ভেঙ্গে গেছে, বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতোই বেশি যে, হিসাব বের করতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তারা। এমন ভয়ানক ঝড় অনেকদিন দেখেনি উপজেলার মানুষ। এদিকে দাকোপ উপজেলার বেড়িবাঁধ রক্ষা পেলেও কয়েক হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতি নিরূপণে কাজ করছে উপজেলা প্রশাসন।
পটুয়াখালীতে বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত ২১ গ্রাম, বিদ্যুৎহীন পুরো জেলা : ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে জেলায় বিধ্বস্ত হয়েছে কয়েকশ কাঁচা ঘরবাড়ি। উপড়ে এবং ভেঙে পড়েছে অসংখ্য গাছপালা। ঁে ধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালীতে পাবিত হয়েছে ২১টি গ্রাম। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত বারো হাজার মানুষ। ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুর-ঘেরের মাছ। এছাড়া বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্তায় রয়েছে পুরো জেলা। ৫/৭ ফুট উচ্চতার দু দফা জোয়ারে পানিতে প্লাবিত হয়েছে দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীর পাঁচটি ইউনিয়নসহ কলাপাড়া ও গলাচিপার বেড়িবাঁধের বাইরের সকল নিম্নাঞ্চল এবং চরাঞ্চল। পায়রা নদির অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি বাঁধ উপচে ভেতরে প্রবেশ করে প্লাবিত হয়েছে দুমকির পাঙ্গাশিয়ার পাঁচটি গ্রাম। পর্যটন নগরী কুয়াকাটায় সমুদ্রপাড়ের অন্তত কয়েকশ কাঁচা দোকান ভেসে গেছে সাগরের জোয়ারের পানিতে। রাতের অস্বাভাবিক জোয়ারে পানি শহর রক্ষা বাঁধ অতিক্রম করে প্লাবিত হয়েছে পটুয়াখালী সদর। এতে ডুবে যায় শহরের সবুজবাগ, পুরান বাজার, কলেজ রোড, কাঠপট্টি এলাকার অধিকাংশ বাসাবাড়ি এবং ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান। এ সময় মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এক ধরনের আতঙ্ক।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে পটুয়াখালীর গলাচিপায় রাসেদ নামে এক শিশু এবং কলাপাড়ায় শাহালম নামে এক সিপিপি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। গলাচিপার পানপট্টি এলাকায় বাবা-মার সাথে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সময় গাছের ডাল ভেঙে চাপা পড়ে মারা যায় রাসেদ। এছাড়া কলাপাড়ায় ঘূর্ণিঝড় অম্পানের সতর্কবার্তা প্রচারণা চালানোর হাফেজ প্যাদার খালে নৌকা ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন সিপিপির কর্মী শাহালম। এদিকে মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন রয়েছে পুরো জেলা। জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, ৭২২টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় তিন লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এসব মানুষজন বাড়ি ফিরে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ দ্রুততার সাথে চলছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে।  
মোংলায় ঘরবাড়ি-গাছপালার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, পাবিত চিংড়ি ঘের : ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে মোংলার পশুর নদিতে একটি ট্যুরিস্ট লঞ্চ ডুবে গেছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাসহ কাঁচা ঘরবাড়ি ও গাছপালার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। প্লাবিত হয়েছে চিংড়ি ঘেরও। তবে ঝড়ে এখানে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। গতকাল বৃহস্পতিবারও মোংলা সমুদ্র বন্দরে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত বলবৎ রয়েছে। এর প্রভাবে বৃহস্পতিবার এ এলাকার উপর দিয়ে প্রচন্ড ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়া অব্যাহত রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রাহাত মান্নান বলেন, সাইকোন শেল্টারে আশ্রয় নেয়া লোকজনের মাঝে বৃহস্পতিবার সকালেও খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বুধবার দিনে এবং রাতে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে নেয়া হয় ৪৮ হাজার মানুষকে। ঝড় কিছুটা কমে যাওয়ায় তারা এখন নিজ বাড়িঘরে চলে যাচ্ছেন। তবে ঝড়ে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের তালিকা পাওয়ার পর জানানো হবে বলেও জানান তিনি। বন্দরের পশুর চ্যানেলের তীরবর্তী কানাইনগর, কলাতলা, সুন্দরতলাসহ বিভিন্ন জায়গার দুর্বল বেড়িবাঁধের কয়েকটি জায়গা ধ্বসে গেছে। তবে আবহাওয়া অফিসের দেয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, কয়েক ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের কথা বলা হলেও মোংলা সমুদ্র বন্দরের পশুর চ্যানেলসহ সুন্দরবনের নদ-নদির পানির উচ্চতা অনেকটা স্বাভাবিকই ছিল। ফলে মোংলাসহ আশপাশ এলাকায় জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। যদিও বেড়িবাঁধ ভেঙে কিংবা উপচে জোয়ারের যে পানি বাঁধের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিল তা আবার ভাটার সময়ে নেমে গেছে। এদিকে আম্পানের তান্ডবে পূর্ব সুন্দরবনের ঢাংমারী স্টেশন, লাউডোব, দুবলা ও মরাপশুর ক্যাম্পের জেটি, ঘরবাড়িসহ অন্যান্য স্তাপনা এবং বনের গাছপালার বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন। তবে এতে কোনো জেলে নৌকা ডুবি, জেলে নিখোঁজ কিংবা হতাহতের খবর নেই বলেও জানান তিনি।
বাউফলে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে কোটি টাকার মাছপানিতে ভেসে গেছে : বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চরাঞ্চলসহ তেঁতুলিয়া ও লোহালিয়া নদির কূলবর্তী এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের জলোচ্ছ্বাসে সহস্রাধিক পুকুরের কোটি টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে। বুধবার সন্ধ্যায় পরে ঘূর্ণিঝড় আম্পান উপকূলীয় এলাকায় এগিয়ে আসলে তেঁতুলিয়া লোহালিয়া নদি এবং পার্শ্ববর্তী খালের পানি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫ থেকে ৭ ফুট বেড়ে যায়। ওইসব এলাকায় বেড়িবাঁধ না থাকায় আবার কোনো জায়গায় বেড়িবাঁধ থাকলেও ছিঁড়ে গিয়ে  প্রচন্ড বেগে পানি উঠতে থাকে। এ সময় পুকুর ও মাছের ঘের পানিতে ডুবে গিয়ে সমস্ত মাছ পানিতে ভেসে যায়।
উপজেলা মৎস্য অফিস ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে তথ্যানুসারে, উজেলার চন্দ্রদ্বীপ, নাজিরপুর, ধুলিয়া, কেশবপুর, কালিশুরী, কাছিপাড়া, নওমালা ও বগা এলাকায় সহস্রাধিক পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক হিসাব অনুসারে, প্রতিটি পুকুরে গড়ে ১০ হাজার টাকার মাছ ক্ষয়ক্ষতি হলে ১ হাজার পুকুরে  সর্বমোট ১ কোটি টাকা মাছ ক্ষতি হয়েছে। চন্দ্রদ্বীপ ইউপি সদস্য আফরোজো বেগম জানান, চরব্যারেট এলাকায় শতাধিক পুকুরে মাছ পানিতে ভেসে গেছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পান হওয়ার আগের দিন তিনি নিজে মাছের ঘেরে রুই, কাতল, পাঙ্গাস পোনা ছেড়েছি। পানিতে আমার সমস্ত মাছ ভেসে গেছে চরওয়াডেল জাহাঙ্গির হাওলাদার জানান, চরওয়াডেল এলাকা ছোট বড় ৪শ পুকুূরের মাছ তেঁতুলিয়া নদীতে চলে গেছে।
বাউফল উপজেলা সিনিয়র মস্য কর্মকর্তা মো: অহেদুজ্জামান জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে অন্যানের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার তালিকা করার জন্য স্বস্ব চেয়ারম্যান সাথে কথা হয়েছে। সঠিক তালিকা নির্ণয় করতে কিছুটা সময় লাগবে।  ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে আর্থিক সহায়তার জন্য ঊর্র্ধ্বতন মৎস্য দফতরে জানানো হয়েছে।  




————











প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে সুজন। আপনি কি এ দাবি সমর্থন করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা