করোনা শনাক্তের দুই মাসে মৃত্যু ২ শতাধিক : আক্রান্ত ১৩১৩৪
৯৮ শতাংশের বেশি শনাক্ত দ্বিতীয় মাসে ॥ মে মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা
Published : Saturday, 9 May, 2020 at 12:00 AM, Update: 08.05.2020 9:35:44 PM
দিনকাল রিপোর্ট
করোনা শনাক্তের দুই মাসে মৃত্যু ২ শতাধিক : আক্রান্ত ১৩১৩৪দেশে প্রথম নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) শনাক্ত হওয়ার দুই মাস পূর্ণ হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা যেমন ছিল, বাংলাদেশেও একই রকম প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে, বাড়ছে সংক্রমণের পরিমাণ। আর সে কারণেই এখন পর্যন্ত যত জনের শরীরে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে কেবল গত ১০ দিনে। শুধু তাই নয়, এই ১০ দিনের কোনো দিনই নতুন সংক্রমণের সংখ্যা পাঁচশর নিচে ছিল না। দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ দিন দিন বাড়ছে। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের ৯৮ শতাংশই শনাক্ত হয়েছে সংক্রমণের দ্বিতীয় মাসে। গতকাল শুক্রবার দেশে করোনা (কোভিড-১৯) সংক্রমণ শনাক্তের দুই সাসে মৃত্যুবরণ করেছেন দুই শতাধিক। আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ হাজার একশ ৩৪ জন। বিশ্বে যেসব দেশে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, সেসব দেশেও প্রথম দুই মাসে মোট আক্রান্তদের ৯৮ শতাংশের বেশি শনাক্ত হয়েছিল দ্বিতীয় মাসে।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশে এখনো সংক্রমণের প্রথম ঢেউ চলছে। গত এক মাস পুরোটাই ছিল সরকারি ছুটি বা অনেকটা লকডাউন (অবরুদ্ধ) পরিস্থিতির মধ্যে। এর মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। ইতিমধ্যে সীমিত পরিসরে পোশাক কারখানা চালু হয়েছে। দোকানপাটও খুলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আক্রান্তের শীর্ষে থাকা দেশগুলোতেও সংক্রমণের তৃতীয় মাসে গিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে দেখা গেছে। বাংলাদেশেও রোগী বাড়ছে। তবে ওই সব দেশে সংক্রমণের দুই মাসের মাথায় আক্রান্তের সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ছিল। ওই দেশগুলোতে শনাক্তের পরীাও অনেক বেশি হয়েছে। দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্তের খবর জানানো হয় ৮ মার্চ। এর এক মাসের মাথায় ৮ এপ্রিল দেশে মোট রোগী ছিলেন ২১৮ জন। ওই সময় পর্যন্ত সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছিল ২২ জেলায়। সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। প্রথম সংক্রমণ শনাক্তের দুই মাসের মাথায় এসে দেশে মোট রোগী শনাক্ত হন ১৩ হাজার ৪১৩৪ জন। দ্বিতীয় মাসে আক্রান্ত বেড়েছে ৯৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত এক মাসে নতুন ৪২টি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়েছে। এনিয়ে দেমের ৬৪ জেলায়ই করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে এখনো সংক্রমণের প্রথম ঢেউ চলছে। সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে দুই মাস শেষে মোট আক্রান্ত ছিলেন ১৫ হাজার ২১৯ জন। মোট আক্রান্তের ৯৯ দশমিক ৯০ ভাগই আক্রান্ত হয় দ্বিতীয় মাসে। ইতালিতে সংক্রমণের দুই মাসে মোট আক্রান্ত ছিলেন ৯২ হাজার ৪৭২ জন। এর ৯৮ দশমিক ৭৮ শতাংশই দ্বিতীয় মাসে আক্রান্ত হয়। স্পেনে দ্বিতীয় মাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন ওই সময় পর্যন্ত মোট আক্রান্তের ৯৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে প্রথম দুই মাসে মোট আক্রান্ত ছিলেন ২৫ হাজার ১৫৪ জন। এর ৯৯ দশমিক ৮৫ শতাংশই আক্রান্ত হয় দ্বিতীয় মাসে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সংক্রমণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল তৃতীয় মাসে। প্রথম দুই মাসের তুলনায় তৃতীয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ৯৭ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ৮৫ শতাংশ রোগী বেড়েছিল। স্পেনে এটি ছিল ৫৫ ও ইতালিতে ৫৪ শতাংশ।
পরীা বাড়ছে, রোগীও বাড়ছে : দেশে শুরুতে শুধু রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পরীা সীমিত ছিল। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে পরীাকেন্দ্র বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৯ এপ্রিল প্রথম এক দিনে ১০০-এর বেশি রোগী শনাক্ত হয়। ১০ দিন ধরে প্রতিদিন ৫০০-এর বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে চার দিন ধরে দৈনিক শনাক্ত হচ্ছে ৭০০-এর বেশি রোগী।
২৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ৩৬ হাজার ৯০টি নমুনা পরীা করা হয়েছিল। এখন ৩৪টি প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীা করা হচ্ছে। গতকাল পরীাকৃত মোট নমুনার সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। গতকাল পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৫ হাজার ৫১৩টি নমুনা পরীা করা হয়। পরীা করা নমুনার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ পজিটিভ বা সংক্রমিত। যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, যুক্তরাজ্য ও ইতালিতে পজিটিভ নমুনা পাওয়ার হার ৯ থেকে ১৬ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত সবশেষ ১০ দিনের প্রতিদিনই করোনাভাইরাসে নতুন সংক্রমণের সংখ্যা ছিল পাঁচ শতাধিক। এর মধ্যে ২৮ এপ্রিল নতুন সংক্রমণ ছিল ৫৪৯টি। পরের প্রতিদিনে সংক্রমণের সংখ্যা সাড়ে পাঁচশরও বেশি। এই ৯ দিনে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে যথাক্রমে ৫৪৯, ৬৪১, ৫৬৪, ৫৭১, ৫৫২, ৬৬৫, ৬৮৮, ৭৮৬, ৭৯০ ও ৭০৬ জনের শরীরে। ল্যণীয় বিষয়, এই ১০ দিনের মধ্যে সাত দিনই সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পরিমাণ আগের দিনের চেয়ে বেশি।
সব মিলিয়ে এই ১০ দিনে মোট সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ছয় হাজার ৫১২টি জনের শরীরে। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত গত দুই মাসে দেশে করোনাভাইরাসে মোট সংক্রমণই শনাক্ত হয়েছে ১৩ হাজার ১৩৪ জনের শরীরে। অর্থাৎ শেষ ১০ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি— ৫২ দশমিক ৪১ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি মূলত নমুনা পরীার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বেড়েছে। কারণ কোভিড-১৯ শনাক্ত করতে এ পর্যন্ত মোট নমুনা পরীা হয়েছে এক লাখ ৫ হাজার ৫১৩টি। অন্যদিকে এই শেষ ১০ দিনেই নমুনা পরীা হয়েছে ৫৫ হাজার ১৭২টি। এই নমুনা পরীার সংখ্যা মোট নমুনা পরীার ৫১ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ নমুনা পরীার সঙ্গে আনুপাতিক হারে বেড়েছে সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যাও।




তবে এই শেষের দিকে এসে কোভিড-১৯ সংক্রমণের সংখ্যা বাড়লেও গড় হিসাবে নমুনা সংক্রমণ শনাক্তের হার মোটামুটি একই রকম রয়েছে। কারণ সবশেষ ১০ দিনে নমুনা পরীার বিপরীতে সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এই হার বরং এপ্রিলের শেষ দুই সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা কমই। কারণ এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে নমুনা পরীার বিপরীতে সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশ, চতুর্থ সপ্তাহে এই হার ছিল ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আর এপ্রিলের শেষ সাত দিনে এই হার ছিল ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আর এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত দুই মাসের তথ্যে নমুনা পরীার বিপরীতে সংক্রমণ শনাক্তের হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
শেষ ১০ দিনে কেবল কমেছে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা। এই ১০ দিনে মোট ৪৭ জন মারা গেছেন। সে তুলনায় এখন পর্যন্ত দুই মাসে ২০৬ জন মারা গেছেন। গত ১০ দিনে মৃতের সংখ্যা মোট মৃত্যুর ২৩ দশমিক ৬১ শতাংশ।






প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
25122 জন