বাংলাদেশে করোনা রোগী বাড়ছে দ্রুত : পর্যাপ্ত চিকিৎসা নেই
Published : Wednesday, 22 April, 2020 at 12:00 AM, Update: 21.04.2020 9:29:06 PM
বাংলাদেশে করোনা রোগী বাড়ছে দ্রুত : পর্যাপ্ত চিকিৎসা নেইবিবিসি বাংলা
বাংলাদেশে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয় করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে, তবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর যে ধরনের চিকিৎসা সুবিধার প্রয়োজন হতে পারে তার প্রচন্ড অভাব দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ - এসব জেলা কোভিড-১৯ বিস্তারের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
কিন্তু বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব জেলায় যথেষ্ট পরিমাণে নিবিড় সেবা ইউনিট বা আইসিইউ, ভেন্টিলেশন এবং আইসোলেশন শয্যা নেই। গুরুতর রোগী হলেই তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক জেলার চিকিৎসকরা।
ভেন্টিলেটরের অভাব : ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে আর কোনো শহরে ভেন্টিলেশন সুবিধা সম্ব^লিত পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ নেই। ফলে কোনো জেলা শহরের রোগীর ভেন্টিলেশন দরকার হলে তাকে ঢাকা পাঠানো ছাড়া গতি নেই। যেমন কিশোরগঞ্জে দুজন চিকিৎসকের করোনা ভাইরাস ধরা পড়ার পর আইসিইউ সুবিধার জন্য তাদের ঢাকায় পাঠিয় দেয়া হয় - কারণ এই জেলা বা আশেপাশের জেলাগুলোয় আইসিইউ সুবিধা সম্ব^লিত কোনো হাসপাতাল নেই।
সিলেটে আইসিইউ থাকলেও, সেখানকার একজন চিকিৎসক সেখানে ভেন্টিলেশন সুবিধা না পেয়ে ঢাকায় আসতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম কোনো চিকিৎসক হিসাবে ঢাকায় তার মৃত্যু হয়।
ভাইরাসের বিস্তার : সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে, গাজীপুরে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেয়ে গেছে। সোমবারে শনাক্ত করা রোগীদের ১৯.৬ শতাংশ গাজীপুরের। (জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানের ম্যাপ দেখতে চাইলে এখানে কিক করুন)
জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। আর এই বৃদ্ধির গতি বেশ দ্রুত, গাজীপুর জেলার সিভিল সার্জন ডা. খায়রুজ্জামান বলেন। করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী বাড়ছে নরসিংদী আর কিশোরগঞ্জের মতো জেলাগুলোতেও। তবে কিশোরগঞ্জের মতো বেশিরভাগ জেলা শহরের হাসপাতালে কোনো আইসিইউ সুবিধা নেই। এখানে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী ৩৮৬ জন হলেও সেখানে আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র আটটি। আইসিইউ শয্যার অপর্যাপ্ততা : স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। কিন্তু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার জন্য সারা দেশে নির্ধারিত আটটি হাসপাতালে মোট আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১৯২টি, যার মধ্যে ৮৯টি ঢাকায়।
শুধুমাত্র বিভাগীয় শহরগুলোর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মোট ৬,৭২৬টি আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত করার কথা জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে। এর মধ্যে ১৫৫০টি শয্যা শুধুমাত্র ঢাকা শহরে।
বাড়িতে রেখে চিকিৎসা : একাধিক জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভাগীয় শহরগুলোর বাইরে জেলা শহরে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের জন্য আইসিইউ সুবিধার ব্যবস্থা নেই।
সুনামগঞ্জের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক বিবিসিকে জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী গুরুতর মনে হলেই তাকে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে একটি আইসোলেশন ইউনিট আছে। তবে বেশিরভাগ রোগীকে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করা হচ্ছে।
এখানে আইসিইউ সুবিধা নেই। তাই যাদের করোনা ভাইরাসের সঙ্গে হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা বা অন্য কোনো জটিলতা রয়েছে, তাদের সবাইকে করোনা ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোয় পাঠিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের ওপর নির্দেশনা আছে- তিনি জানান।
চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা : কয়েকটি জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত জেলা শহরগুলোয় যেসব রোগী পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বেশিরভাগকে বাড়িতে রেখে বা হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে।
যাদের বাড়িতে থাকা সমস্যা, কিংবা জ্বর বা অন্য কোনো জটিলতা রয়েছে, তাদের হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
গাইবান্ধার একজন রোগী বিবিসিকে বলেন, হাসপাতালে ভালো সুবিধাই পেয়েছি। নার্সরা ততোটা কাছে আসেনি। কিন্তু টেলিফোনে চিকিৎসকরা নিয়মিত খোঁজ খবর নিয়েছেন। খাবার ভালো ছিল।
তবে এখনো জেলা শহরগুলোয় যে সংখ্যায় আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা তার চেয়ে কম। ফলে হাসপাতালগুলোয় এখনো অনেক আইসোলেশন শয্যা ফাঁকা রয়েছে।
কিন্তু রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলেই সংকট শুরু হওয়ার আশঙ্কা করছেন কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন মোঃ মুজিবুর রহমানের মতো অনেক কর্মকর্তা।
মি. রহমান বলেন, কিশোরগঞ্জে আইসিইউ সুবিধার কোনো হাসপাতাল নেই। ফলে সেরকম গুরুতর কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ঢাকায় পাঠাতে হবে।
আমাদের অক্সিজেন আছে, আইসোলেশন শয্যা আছে। জেলা শহর হিসাবে এখন পর্যন্ত আমাদের যে প্রস্তুতি আছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট, তিনি বলেন। তবে যদি আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়, তাদের মধ্যে যদি জটিলতা বেশি থাকে, তখন হয়তো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে।
চিকিৎসক সংকটের আশঙ্কা : চিকিৎসকরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের লণ থাকার পরেও অনেক রোগী সেটা লুকিয়ে রেখে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যার ফলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরাও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। কিশোরগঞ্জ জেলার চারশো স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ৪১ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
বাংলাদেশের জেলা বা উপজেলা শহরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অপ্রতুলতার অভিযোগ নতুন নয়। এবারে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম না পাওয়ার অভিযোগ।




একাধিক চিকিৎসক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী পিপিই পাননি, ফলে তাদেরই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
একদিকে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, আরেক দিকে আরও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়ে পড়া শুরু করলে, জেলা বা উপজেলা শহরের স্বাস্থ্যকর্মী সংকট শুরু হওয়ারও আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।






প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
25103 জন