২ কোটি লোককে সহায়তার আহবান
সরকারের প্যাকেজে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপেক্ষিত : সিপিডি
Published : Tuesday, 14 April, 2020 at 12:00 AM, Update: 13.04.2020 9:42:52 PM
দিনকাল রিপোর্ট
চাল চোররা যাতে আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে সে ব্যাপারে সরকারকে আরো সচেষ্ট থাকার আহ্বান জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা (সিপিডি)। গতকাল সোমবার সকালে অনলাইন ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন সংস্থাটির ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতের জন্য সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে; যা ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ হবে। কিন্তু ব্যাংকি খাতে সুশাসনের অভাব রয়েছে। ব্যাংকের মাধ্যমে সঠিকভাবে সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ বিতরণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে সিপিডি। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ত্রাণের চাল চুরি হচ্ছে, এবিষয়ে সিপিডির অবস্থান কি? জবাবে সংস্থাটির ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই ক্রান্তিকালে চাল চোরদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। আইনের ফাঁক দিয়েও যেন তারা বের হতে না পারে। সে ব্যাপারে প্রশাসনকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে বলে জানান তিনি।
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি পরিবারকে প্রতি মাসে আট হাজার টাকা করে প্রণোদনা দেয়ার সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফল পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডির সুপারিশ হলো, দেশের ১ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ৯০ লাখ পরিবারকে দুই মাস এই টাকা দেওয়া যেতে পারে। তবে প্রণোদনার টাকা মাসভিত্তিক নয়, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সপ্তাহভিত্তিক পরিবারপ্রতি ২ হাজার টাকা করে দেওয়া উচিত। সিপিডি বলছে, এভাবে প্রণোদনা দিলে দেশের ছয় কোটি ৮৪ লাখ থেকে ৭ কোটি ৫৭ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা যাবে।
সিপিডি হিসেব করে দেখেছে, এসব দিন আনে দিন খাই মানুষকে আর্থিক প্রণোদনা দিলে সব মিলিয়ে ২৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা থেকে ২৯ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা লাগবে। সিপিডি মনে করে, আর্থিক প্রণোদনা দিলে শুধু দরিদ্র মানুষই উপকৃত হবে না, চাহিদা বেড়ে অর্থনীতিতে চাঙাভাব ফিরে আসবে।
এই বিষয়ে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিলে মূল্যস্ফীতিতে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। কারণ এটি সাময়িক সময়ের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে। সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, দরিদ্রদের টাকা দেওয়া হলে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন খাতে চাঙাভাব ফিরে আসবে। যা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। গরিব মানুষকে আগামী দুই-তিন মাস বাঁচিয়ে রাখার জন্য জরুরি ভিত্তিতে এই প্রণোদনা দেওয়া উচিত। সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, করোনা ভাইরাসের কারণে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপেক্ষিত হয়েছে। তাদের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই। গতকাল সোমবার ‘কোভিড-১৯ সরকারের পদক্ষেপ সমূহের কার্যকারিতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও আয় নিরাপত্তা: সিপিডি’র প্রাথমিক বিশ্লেষণ ও প্রস্তাব’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। ভার্চুয়াল মিডিয়া ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এতে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। সরকারের ঘোষণা করা বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ বিশ্লেষণ, প্রান্তিক জনগোষ্টির জন্য খাদ্য ও আয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের অর্থ, খাদ্য, রাজস্ব ও আর্থিক প্রণোদনা লাগতে পারে সে বিষয়ে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে সিপিডির দেয়া বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয় এই ব্রিফিংয়ে। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে সরকার যে বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কোন সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই। তিনি বলেন, ২৫শে মার্চ রফতানিমুখী শিল্পের জন্য সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষাণা করেছে। যার সুদের হার দুই শতাংশ। যেটা এ খাতের প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারবে। ৫ই এপ্রিল সরকার আরো ৪টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যার পরিমাণ ৬৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। সর্বশেষ কৃষি খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়েছে ৫ শতাংশ সুদহারে। যে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে এর বেশিরভাগই ব্যাংক নির্ভর। বলা হয়েছে ব্যাংক ও ক্লাইন্টের সম্পর্কের ভিত্তিতে এ প্রণোদনা দেয়া হবে। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বলার অপেক্ষা রাখে না এই প্রণোদনায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কোন সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই। যদিও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ঘোষণায় বালেছেন যে বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ করা হবে। ভিজিএফ, ভিজিডির মাধ্যমে খাদ্য বিতরণ করা হবে, খোলা বাজারে চাল বিক্রি করা হবে। বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। যারা অনানুষ্ঠানিক খাতে আছে, দিনমজুর রিকশাওয়ালা ইত্যাদি তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খাদ্যো সহায়তা এবং অর্থ সহায়তা দেয়া হবে। করোনা মোকাবিলায় যে প্রণোদনা ঘোষাণা করা হয়েছে এটার বরাদ্দের ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ড. ফাহমিদা খাতুন। যাতে ক্ষতিগ্রস্ত লোকেরা এবং ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলো এ প্রণোদনা পায়। মূল প্রতিবেদনে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১ কোটি ৭০ লাখ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পরিবারকে আগামী দুই মাসে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা আর্থিক সাহায্য দেয়ার প্রস্তাব করছে সিপিডি। এজন্য ২৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা থেকে ২৯ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা লাগবে। আর এটি জিডিপির প্রায় ০ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ।  




সর্বশেষ খানা আয় জরিপ অনুযায়ী, যাদের আয় ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা তাদের সাহায্যের আওতায় আনার প্রস্তাব জানিয়ে সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘যাদের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকা, তাদেরকে প্যাকেজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আমাদের হিসাবে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ পরিবারকে সাহায্য দেয়ার প্রয়োজন আছে।
সর্বশেষ খানা-আয় ব্যয় জরিপ বিবেচনায় নিয়ে আমরা দারিদ্য রেখায় থাকা পরিবারকে প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা করে দুই মাসে ১৬ হাজার টাকা দেয়ার প্রস্তাব করছি। এজন্য ২৬ হাজার ৯৬২ থেকে ২৯ হাজার ৮৫২ কোটি টাকার মতো দরকার হতে পারে। এ সাহায্য নগদে দিতে হবে। আর এটি জিডিপির প্রায় ০ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ।  সিপিডির গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরার সময় প্রতিষ্ঠানটির রিসার্চ ফেলো তৌফিক ইসলাম বলেন, ‘আমরা দেখেছি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশই বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নেই। বয়স্কদের ৬৬ শতাংশ, শিশুদের ৭০ দশমিক ৬০ শতাংশ, নতুন মা হওয়া নারীদের ৭৯ দশমিক ১০ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধীদের ৮১ দশমিক ৫০ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে নেই। তিনি বলেন, ‘বর্তমান কাঠামোর মধ্যে যদি কর্মসূচি চালানো হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্তদের বড় অংশ নিরাপত্তা পাবেন না। বিশেষ করে যারা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজ করেন তারা এখনও পর্যন্ত সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে আসেননি, সেটা চিন্তার বিষয়। আর একটা বড় চিন্তার বিষয় যারা বিদেশে কাজ করেন, তারা হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে আছেন। আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার যেসব কর্মসূচি তা গ্রামের জন্য তৈরি করা। শহরের যারা দরিদ্র মানুষ আছেন বা প্রাদুর্ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তাদের অন্তর্ভুক্ত করা চ্যালেঞ্জ। অনেক জায়গায় সাহায্য দেয়ার জন্য স্থানীয় সরকারভিত্তিক তালিকা করা হয়। সেই তালিকা অনুযায়ী বড় অংশকে সাহায্য দেয়া যাবে না কি সন্দেহ আছে বলে মনে করেন তৌফিক ইসলাম।






প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
25177 জন