করোনার উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮ জনের মৃত্যু
Published : Tuesday, 7 April, 2020 at 12:00 AM, Update: 06.04.2020 10:21:23 PM
আবদুল্লাহ জেয়াদ, দিনকাল
আমাদের দেশে প্রাণঘাতী করোনা দিন দিন ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এ ভাইরাসের কবলে প্রতিদিনই ৭-৮ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। শেষ খবর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন করে ৭ জন করোনা আক্রান্ত  ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন ইউনিট থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে আবুল বাশার (৫০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থেকে এসে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলেন। আবুল বাশার ব্রেইন স্ট্রোক নিয়ে গত শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেলের মেডিসিন ইউনিটে ভর্তি হয়। পরে শ্বাসকষ্ট হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন রবিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মারা যায়। স্বজনরা বিকালে মরদেহ নিয়ে গ্রামে চলে গেছে।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে আব্দুল মজিদ (৮০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার রাতে উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রাম থেকে করোনার উপসর্গ নিয়ে হালুয়াঘাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসার পথে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় গতকাল সোমবার সকালে মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন হালুয়াঘাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা মুনির আহমেদ। এছাড়া মৃত ব্যক্তির বাড়ি থেকে সবাইকে বের না হতে নির্দেশনা দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম।
শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর চট্টগ্রামে এক মুক্তিযোদ্ধাসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত ছিলেন কি না জানতে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেল ৩টার দিকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশনে থাকা মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। এর আগে রবিবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় এক যুবকের।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি মিয়া বলেন, জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তি শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। আর মেডিকেলে যিনি মারা গেছেন তার কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ নিউমোনিয়ার উপসর্গ ছিল। তারা কেউই বিদেশফেরত নন। বিদেশফেরত কারও সংস্পর্শে আসার হিস্ট্রিও নেই। তবুও আমরা তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য বিআইটিআইডিতে পাঠিয়েছি।
সিভিল সার্জন জানান, ৭১ বছর বয়সী ব্যক্তি রবিবার চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার ফৌজদারহাটে বিআইটিআইডিতে চিকিৎসা নিতে যান। গতকাল সোমবার ভোরে তাকে জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সূত্র জানায়, মৃত ব্যক্তির বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলায় এবং তিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। সিভিল সার্জন জানান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যুবককে রবিবার রাতে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পাঠানো হয়। তিনি আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সকালে ভর্তি হয়েছিলেন। চমেক হাসপাতালে আনার পরই তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত যুবকের বয়স আনুমানিক ২২ বছর। তার বাড়ি আনোয়ারা উপজেলার মধ্যম শিলাইনগর গ্রামে বলে সূত্র জানিয়েছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় শ্বাসকষ্ট ও গলাব্যথায় শরীফ মোহাম্মদ (২২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। শরীফ মোহাম্মদ ওই এলাকার মৃত আবুল কালামের ছেলে। এর আগে শ্বাসকষ্ট ও গলাব্যথা নিয়ে সন্ধ্যায় তাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে আইসোলেশনে রাখা হয়। ইতিমধ্যে তার নমুনা সংগ্রহ করে ফৌজদারহাট বিআইটিআইডিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা বোরহান উদ্দিন চৌধুরী মুরাদ বলেন, শ্বাসকষ্টজনিত রোগে শরীফের মৃত্যু হয়েছে। তার লাশ চমেক হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি আমি উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করেছি। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জোবায়ের আহমেদ বলেন, খবর পেয়ে রবিবার রাতেই আমরা ওই এলাকায় গিয়েছি। সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বিআইটিআইডি থেকে রিপোর্ট পাওয়া যাবে। রিপোর্ট পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলায় ঢাকা থেকে সপ্তাহখানেক আগে আসা এক ব্যবসায়ী (৪৫) জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার সন্দেহে তার শরীরের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সিভিল সার্জন মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তার ডায়াবেটিস ছিল। সুগার কমে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকে তিনি মারা যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারপরও যেহেতু এলাকায় একটি আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তাই মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, ওই ব্যক্তির ঢাকায় মুদি দোকান রয়েছে। তিনি সপ্তাহখানেক আগে গ্রামের বাড়িতে এসে জ্বর ও কাশিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। রবিবার রাতে তিনি জ্বর নিয়ে মারা গেলে এলাকাবাসীর মধ্যে করোনা আতঙ্ক তৈরি হয়। ভয়ে কেউ তার লাশ দেখতে যাননি। তবে তার নমুনা পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেয়ায় এলাকাবাসীর মনে কিছুটা স্বস্তি বিরাজ করছে। করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিনুল ইসলাম জামান, এলাকাবাসীর মধ্যে এ নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। খবর পেয়ে সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে এলাকাবাসীকে শান্ত থাকতে আহ্বান জানিয়েছে।
করোনার উপসর্গ নিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশনে থাকা আবু শেখ (৭০) নামের এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তার  বাড়ি জেলার মধুখালী উপজেলার জাহাপুর ইউনিয়নের চরমুরারদিয়া গ্রামে। এলাকাবাসী জানায়, আবু শেখ গত ৫ মার্চ সর্দি জ্বর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন। সেখানে চিকিৎসক তাকে করোনা সন্দেহে হাসপাতালের আইসোলেশনে রাখলে গতকাল সোমবার সকালে তার মৃত্যু হয়। ফরিদপুরের সিভিল সার্জন জানান,  মৃত ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। এখন আমরা মৃতের পরবর্তী কাজ সম্পাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এদিকে ফরিদপুর পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ হতে এ গ্রামটি লকডাউন করা হয়েছে বলে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান জানান।
করোনা উপসর্গ নিয়ে ববিতা খানম (২৬) নামের এক গৃহবধূকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।  রবিবার রাতে সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে তিনি ভর্তি হন।  উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ও উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আনোয়ার হোসেন জানান, গতকাল সোমবার ওই গৃহবধূর নমুনা সংগ্রহ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ববিতা খানম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মরত ডা. আলামিনের স্ত্রী এবং উপজেলার বামন ঘিয়ালা গ্রামের বাসিন্দা।




গাইবান্ধার সদর উপজেলা কামারজানিতে আব্দুল রাজ্জাক নামের এক ব্যক্তির রবিবার সন্ধ্যায় জ্বর ও শ্বাসকষ্টে মৃত্যু হয়েছে। অপরদিকে  গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় জ্বর, সর্দি-কাশিতে এক ব্যক্তি মারা গেছে। রবিবার দুপুরে উপজেলার গুমানিগঞ্জ ইউনিয়নের অনন্তপুর গ্রামে তার মৃত্যু হয়েছে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের গোঘাট গ্রামের মো. ফজলু মিয়ার ছেলে আব্দুর রাজ্জাক (৩২) বিকাল সাড়ে তিনটায় নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুতে গ্রামবাসীর সন্দেহ হলে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিষয়টি প্রশাসনকে অবগত করে। এর প্রেক্ষিতে গাইবান্ধা জেলার সিভিল সার্জন ডা. এবিএম আবু হানিফের নির্দেশনায় সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. গোলাম মোস্তফা  মেডিকেল টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করেন।
সরকারি বিধিমোতাবেক গাইবান্ধা ইসলামী ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষিত ইমামদের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কামারজানি ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম জাকির, মেডিকেল অফিসার ডা. আতিকুর রহমান, ইউপি সচিব সরওয়ার হোসেন, ইউপি সদস্য আবু তালেব আকন্দ। পরে মৃত ব্যক্তির বাড়ির আশপাশে ৩টি পরিবারকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। মৃত ব্যক্তি জীবিত থাকাকালীন যে চিকিৎসক তার চিকিৎসা করেছিলেন তাকেও হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়।






প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
25183 জন