গার্মেন্ট কোথাও খোলা কোথাও বন্ধ : কাজে হাজার হাজার শ্রমিক
Published : Monday, 6 April, 2020 at 12:00 AM, Update: 05.04.2020 9:37:35 PM
আবদুল্লাহ জেয়াদ, দিনকাল
করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় মানুষের স্থানান্তর বন্ধ, মানুষকে ঘরে রাখা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে রাজধানীসহ সারা দেশে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী। তবে আগের চেয়ে সারা দেশেই অভিযান বেড়েছে। অপ্রয়োজনে বের হলেও করা হচ্ছে জেরা ও জরিমানা। এমনকি জেলেও পাঠানো হয়েছে। তবু সবাই মানছে না সরকারি নির্দেশনা। এরপর আবার গত শনিবার লাখ লাখ শ্রমিক রাজধানীতে ঢোকায় এবং পোশাক কারখানাগুলো চালু হওয়ায় পরিস্থিতি আরো অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজধানীতে আগের দিনগুলোর তুলনায় গাড়ির আধিক্য ছিল। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গাড়িগুলো বের হওয়ার কারণ জানতে চায়। তারাও নানা ধরনের প্রয়োজনীয় কাজের কথা বলে পার পেয়ে যায়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে লোকজন চলাফেরা করছিল না। অলিগলিতে মানুষজন আড্ডাও দিচ্ছিল।
করোনা ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রমণের ঝুঁকি সামলাতে সামাজিক ও ব্যক্তিগত দূরত্ব বজায় রাখার কঠোর অবস্থানের পরও গাজীপুরের পোশাক কারখানাগুলোতে রয়েছে বিশৃংখলা। অধিকাংশ কারখানাই ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পরিশোধ করা হয়নি শ্রমিকদের বেতন-ভাতা। আবার কিছু কিছু কারখানা পিপিই কিংবা মাক্স তৈরির কথা বলে এবং নানা বাহানায় খোলা রাখা হয়েছে। আবার এমনও কারখানা রয়েছে যেখানে বেতন-ভাতাদি না দিয়ে একমাসের ছুটি ঘোষণা করলে সেখানে শ্রমিক বিক্ষোভ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। অধিকাংশ কারখানা ছুটি হওয়ায় অসংখ্য শ্রমিক নানা ভোগান্তি মাথায় নিয়ে ফিরছেন তাদের গ্রামের বাড়িতে।
দেশের করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির সংকটজনক অবস্থায়ও গাজীপুর মহানগর ও জেলা জুড়ে খোলা রয়েছে শতাধিক শিল্প কারখানা। সকালে দলে দলে শ্রমিকরা কারখানায় আসলেও বিজিএমইএর সভাপতির আহবানে সাড়া দিয়ে ছুটি দেয়া হয় অধিকাংশ কারখানা। ছুটি ঘোষণা হয়েছে এমন কয়েকটি কারখানা শ্রমিকদের অভিযোগ, কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের হাজিরা কার্ড জমা রেখে ছুটি ঘোষণা করছেন। আর বেতন না দিয়ে মোবাইলে বেতন পাঠানো হবে বলেও বলছেন কর্তৃপক্ষ।  হাজিরা কার্ড কর্তৃপক্ষের কাছে রেখে দেয়ায় বেতন পাবে কিনা বা  করোনা সংকট লাঘব হলে তাদেরকে আবারো চাকরিতে ফিরিয়ে নেয়া হবে কিনা, এমন দুশ্চিন্তায় রয়েছে তারা।
আবার অনেক পোশাক শিল্প কারখানা খোলা রেখেছে। অপরদিকে, গাজীপুরের কামারজুরী এলাকার একটি সোয়েটার কারখানা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ না করে এক মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করলে কারখানায় কর্মরত হাজারো শ্রমিক বিক্ষোভ করে।
ঢাকার আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর এলাকায় বিভিন্ন কারখানায় অবাধে কাজ চলছে। কোনো কোনো কারখানা আংশিক খোলা রাখা হয়েছে। শ্রমিকরা জানতেন, ৫ এপ্রিল থেকে কাজ করতে হবে। একদিকে লকডাউন। যানবাহন চলাচল বন্ধ। অন্যদিকে চাকরি হারানোর ভয়। তাই চাকরি রক্ষা করতেই ঢাকায় এসেছেন হাজার হাজার শ্রমিক। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল থেকে পায়ে হেঁটে এসেছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ)’র আহবান উপেক্ষা করেই অনেক কারখানা খোলা রেখেছেন মালিকরা। জরুরি কাজের কথা বলে আশুলিয়ার পলাশবাড়ির স্কাইলেন গার্মেন্টসে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। ওই গার্মেন্টেসে সহস্রাধিক শ্রমিক কাজ করছে। একইভাবে ওই এলাকার জামগড়ার এফএনএফ গার্মেন্ট, ইপিজেডের শান্তা গার্মেন্টসে কাজ করছেন দুই সহস্রাধিক শ্রমিক। গোল্ডটেক্স গার্মেন্টে কাজ করছেন প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক। এছাড়াও গ্লোবাল, এসকেআরএম ফ্যাশন লিমিটেডে প্রায় এক হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। আশুলিয়ার এলায়েন্স গার্মেন্টস খোলা ছিলো ১১টা পর্যন্ত। পরে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিয়ে দাবি তোলেন ইউনিয়নের নেতারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকলে গার্মেন্ট বন্ধ ঘোষণা করেন কর্তৃপক্ষ। সাভারের আল মুসলিম, আল লিমা কারখানায় দুই সহস্রাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। আশুলিয়ার জুরাবোর জেএল সুয়েটার, আইরিশ, আনজে রেফারেন্স, ডিাজাইনার ফ্যাশন, স্প্র্রিং সুয়েটার, সরকার মার্কেটের বিশাল সুয়েটার, বাইপাইলের এসকেআরএমএস, এক্টর বিডি লিমিটেডসহ বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। তবে সাভার, গাজীপুর, উত্তরা, মিরপুরের বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ রয়েছে।
করোনা ভাইরাসের কারণে ছুটি হইল। টাকা নাই। বাড়িত চইলা গেলাম। চাকরি বাঁচাবার জন্য শনিবার চইলা আসলাম। আইসা শুনি আবার ছুটি। আগে জানাইলে কি হইতো? আসলে আমরা শ্রমিক না মানুষ, বুঝতে পারি না- গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার একটি পোশাক কারখানার অপারেটর মুজিবুর রহমান মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় গাড়ির জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় এসব কথা আক্ষেপের সুরে বলেন। তিনি গত শনিবার সারা দিন হেঁটে ও ভেঙে ভেঙে ছোট ছোট গাড়িতে করে শ্রীপুরে পৌঁছান। পরে আবারও ছুটি ঘোষণার পর রবিবার তার স্ত্রী ও ৬ মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
একটি খোলা ট্রাকে আরও অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে জায়গা পেয়েছেন শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার দ্বীন ইসলাম। তিনি শ্রীপুরের গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী এলাকার একটি পোশাক কারখানার কর্মী। তার কোলে সাত-আট মাস বয়সী এক শিশু। নিজের ট্রাভেল ব্যাগ থেকে একটি গেঞ্জি বের করে শিশুর মাথায় দিয়ে তীব্র রোদ নিবারণের চেষ্টা করছিলেন তিনি। তিনি বলেন, অনেক কষ্টে আছি ভাই। ভাইরাসের ভয়ের ভেতরেও বাড়িতে যাইতে হইতেছে। গাড়ি বন্ধ রাইখা আমগরে এখানে আনার দরকার ছিল? আবার আমগর উপরে এমন বিপদ চাপাইয়া দেয়া হইলো।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মুলাইদ এলাকায় পিকআপের ২৫ যাত্রীকে নামিয়ে দিয়েছে পুলিশের একটি টহল দল। পরে তারা হেঁটে ময়মনসিংহ অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। তাদের মধ্যে শরিফুল ইসলাম নামের একজন বলেন, কীভাবে যাব কিচ্ছু জানি না। গাড়ি থেকে নামায়া দিয়েছে পুলিশ। এ এলাকায় থাকলে খামু কী? হাতে টাকা তো নাই।
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে গাদাগাদি করে ট্রাকে উঠলেন কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে রোজিনা পারভীন নামের এক পোশাক শ্রমিক বলেন, কী করমু, বাধ্য হইছি। আমরা পোশাক শ্রমিক। আমাদের জীবন এভাবেই চলে।
টহল পুলিশের ভয়ে গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী এলাকায় ট্রাকের পেছনে যাত্রীদের টেনেহিঁচড়ে দ্রুত তোলা হচ্ছে এমন দৃশ্য দেখা যায়। গতকাল রবিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী বাসস্টেশন থেকেই অন্তত ১৫টি ট্রাক-পিকআপকে যাত্রী নিয়ে যেতে দেখা গেছে। এসব ট্রাক-পিকআপে সামাজিক দূরত্ব বলতে কিছুই ছিল না।
এসব বিষয়ে মাওনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুরুল হক বলেন, সার্কেল এএসপির নেতৃত্বে ওসি মাওনা হাইওয়ে, ওসি নাওজোর ও ওসি ভরাডোবা অন্তত ৩০ জন পুলিশসহ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশালের বৈলর পর্যন্ত ঘুরে এসেছি। পথে যাদেরই খোলা ট্রাকে যেতে দেখেছি, তাদের সম্মানের সঙ্গে করোনা ভাইরাস বিষয়ে সচেতন করেছি।
তিনি আরও বলেন, মাওনা হাইওয়ের অধীনে বিভিন্ন এলাকার মানুষকেও সচেতন করছি।




পোশাক শ্রমিক মনিরা জানান, সকালে কারখানায় যাওয়ার জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরমধ্যেই ফোনে জানতে পারেন কারখানায় নোটিশ ঝুলানো হয়েছে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ। অনেকেই কারখানা পর্যন্ত যান। সেখানে মাইকিং করে বন্ধের বিষয়টি ঘোষণা করা হয়। কারখানা বন্ধের কারণেও বিপাকে পড়েন শ্রমিকরা। পায়ে হেঁটে পরিশ্রম করে ঢাকায় এসেছেন। এখন আবার ছয় দিন বাসায় থাকতে হবে। জমানো টাকা খরচ করে বা ধার দেন করেই চলতে হবে তাদের।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক কে এম মিন্টু জানান, প্রায় ১০ হাজার পোশাক কারখানা রয়েছে। এরমধ্যে ১০ থেকে ১৫ পার্সেন্ট কারখানা খোলা আছে। এর বেশিরভাগ কারখানা গাজীপুর ও আশুলিয়া এলাকায়। শ্রমিক নেতা কে এম মিন্টু বলেন, যেখানে করোনা ভাইরাস প্রতিহত করতে সব লকডাউন করা হয়েছে। জনসমাগম এড়িয়ে যেতে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হচ্ছে। এইজন্য দন্ডও দেয়া হচ্ছে। সেখানে কারখানা খোলে ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছেন কারখানার মালিকরা। কারখানায় শ্রমিকরা পাশাপাশি বসে কাজ করে। সেখানে হাজার হাজার শ্রমিকের সমাগম হয়। এই অবস্থায় ভাইরাসটি শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে এই দায় কে নেবে। কারখানা খোলা রাখার জন্য মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও শ্রমিকদের সুরক্ষার দাবি জানান তিনি।






প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
25179 জন