বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ৮৫ শতাংশ ডাক্তার-নার্স অনুপস্থিত
Published : Sunday, 5 April, 2020 at 12:00 AM, Update: 04.04.2020 10:06:45 PM
দিনকাল রিপোর্ট
করোনা ভাইরাসের সঙ্গে চিকিৎসা যুদ্ধে গোটা পৃথিবীই ব্যস্ত। পৃথিবীর অনেকে দেশের চিকিৎসক অবসর ভেঙে ফিরেছেন চিকিৎসাসেবায়। দেশ এবং দেশের মানুষের সেবার মহানব্রত নিয়ে তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন।
কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রামের অবস্থা আরো শোচনীয়। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সসহ অন্য কর্মীদের উপস্থিতি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। উপস্থিতির গড় হার ১৫ শতাংশের মতো। ঢাকার বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ রয়েছে। এমনকি নামিদামি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক ও নার্সরা ছুটি কাটাচ্ছেন নিরাপত্তার অজুহাতে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী গত শুক্রবার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন হাসপাতাল-ক্লিনিক-চেম্বার বন্ধ রাখলে কঠোর ব্যবস্থা। বিএনপির পক্ষ থেকে গতকাল দলের মহাসচিব বলেছেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে।
 এদিকে ঢাকার হাসপাতালগুলো বন্ধ থাকায় করোনা নয় অন্যান্য রোগের চিকিৎসাও পাচ্ছে না। ফলে ক্যান্সার, হার্ট, ডায়াবেটিস, কিডনিসহ জটিল রোগের চিকিৎসা পাচ্ছে না। চট্টগ্রামের চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বেসরকারি হাসপাতালের মতোই সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের উপস্থিতি কমেছে বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে উচ্চপর্যায়ে। দেশব্যাপী চিকিৎসা সেবা বিঘিœত হওয়ার মাঠরিপোর্ট দেশের শীর্ষমহলের কাছে পৌঁছেছে।
চট্টগ্রামের একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা প্রায় প্রতিদিনই বেসরকারি হাতপাতালেরর কর্মরত চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করছে। সেই রিপোর্ট চূড়ান্ত করে পাঠানো হচ্ছে উচ্চপর্যায়ে। এমন একটি রিপোর্ট কালের কণ্ঠের এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম নগরীতে সাধারণ সর্দি-কাশির চিকিৎসাও হচ্ছে না। প্রায় সব বেসকরারি হাসপাতাল হাতগুটিয়ে বসে আছে। দেশের চরম দুঃসময়ে হাসপাতালগুলো সেবাযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে না হয়ে কার্যত চিকিৎসাব্যবস্থা অচল করে দিয়েছেন।
এই কারণেই গত দুই এপ্রিল সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হালিশহর এলাকার এক বাবা তার শিশু সন্তানকে জ্বরের চিকিৎসা করাতে না পেরে হতাশ হয়ে যান কোতোয়ালী থানায়। কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন এই বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে ফোন করে নগর পুলিশের উপ-কমিশনার আবদুল ওয়ারিশকে। তিনি ফোন করেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ শেখ ফজলে রাব্বিকে। শেষ পর্যন্ত সির্ভিল সার্জনের পরামর্শে শিশুটিকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানে শিশুটির চিকিৎসা হয়।
একই বিষয়ে নগর পুলিশের বিশেষ শাখার উপ-কমিশনার আবদুল ওয়ারিশ বলেন, ‘করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ফলে একটু সংকট যাচ্ছে। এই কারণে শিশুর বাবা সন্তানের চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত সিভিল সার্জনের সহযোগিতায় শিশুর চিকিৎসা হয়েছে।’
আবার সীতাকুন্ডের বাসিন্দা এক নারী ছিলেন নগরীর মেহেদীবাগ এলাকার ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই নারীকে চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে আইসিইউ থেকে নামিয়ে দেয়। এরপরই বুধবার রাতে ওই নারীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর পরীক্ষায় জানা গেল, ওই নারী করোনা আক্রান্ত ছিলেন না। একইভাবে শুক্রবার রাতেও পতেঙ্গা থানার এক নারীর মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসার অভাবে। ওই নারীর সন্তান নানাভাবে চেষ্টা করেও চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতালে মায়ের চিকিৎসা করাতে পারেননি। একইভাবে হাটহাজারী উপজেলার বাসিন্দা আরেক নারীর মৃত্যুও হয়েছে চিকিৎসার অভাবে। এই দাবি ওই নারীর স্বজনদের।
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসা ব্যবস্থা অঘোষিতভাবে বন্ধ করে দেয়ার কারণে চট্টগ্রামে প্রতিদিনই বিনাচিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। কিন্তু নিরুপায় রোগী ও স্বজনরা কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না।
এমতাবস্থায় চট্টগ্রামের একটি গোয়েন্দা সংস্থা মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি হাসপাতালে গিয়ে জরিপ করেছেন। কোন হাসপাতালে কতজন চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য পদে কর্মরত আছেন। এবং ডিউটিতে কতোজনকে উপস্থিত পাচ্ছেন সেই তথ্য নেয়া হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার মাঠপর্যায়ে জরিপের পর ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীর বেসরকারি পর্যায়ের পার্কভিউ হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ১০০ জন। কিন্তু হাসপাতালে উপস্থিত রয়েছেন ১০ জন। আর ৩০০ জন নার্স-আয়াসহ অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে উপস্থিত মাত্র ১৮ জন। শেভরণ হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাক্তারের সংখ্যা ৭০ জন, উপস্থিত মাত্র সাতজন। অন্যান্য পদে ৯২ জন কর্মীদের মধ্যে উপস্থিত ছিল ৪২ জন। রয়েল হাসপাতালে ৪০ জন ডাক্তারের স্থলে উপস্থিত মাত্র চারজন, ৬০ জন নার্সসহ অন্য কর্মীদের মধ্যে উপস্থিত ছয়জন। মেডিকেল সেন্টারে ৪৮ জন ডাক্তারের মধ্যে উপস্থিত ১২ জন, নার্সসহ অন্যপদে ১৪০ জনের মধ্যে উপস্থিত ৪০ জন। সার্জিস্কোপ হাসপাতালে (ইউনিট-১) ২১ জন ডাক্তারের মধ্যে উপস্থিত চারজন, নার্সসহ অন্যকর্মী ১৫০ জনের মধ্যে ৩৬ জন। একই হাসপাতালের ইউনিট-২ এ ৩০ জন ডাক্তারের মধ্যে ছয়জন এবং নার্সসহ অন্যপদে ১০৮ জনের মধ্যে ২৪ জন উপস্থিত ছিলেন।
এভাবে নগরীর সব বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তার এবং নার্সসহ অন্যপদের কর্মীরা অনুস্থিত থাকছেন। ফলে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় রোগী মারা যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহকারী গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘গড়ে প্রতিটি হাসপাতালে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ ডাক্তার-নার্সসহ অন্য পদের কর্মীরা অনুপস্থিত। এই কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউগুলোও মূলত খালি হয়ে গেছে। এখন হাসপাতালগুলোতে রোগী গেলেও চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এমন বাস্তব চিত্র প্রতিনিয়ত দেখছি।’
এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন পেয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেসব বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসা দেবে না- সেগুলোর বিষয়ে সরকার কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে।’




বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হয়ে অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা যখন পুনরায় কর্মে ফিরেছেন তখন চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল এবং চিকিৎসকেরা কেন হাতগুটিয়ে বসে আছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ও করোনা ভাইরাস বিষয়ক চট্টগ্রাম বিভাগীয় সেলের সমন্বয়ক ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে চলমান এই যুদ্ধে ডাক্তার-নার্সসহ সবাই অবশ্যই ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করবেন। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামনের সারি থেকে ডাক্তাররা কখনোই পিছপা হবেন না। তবে শুরুতেই ডাক্তার-নার্সদের পিপিই না থাকার কারণে সমস্যা হয়েছিল। এখন সরকার পর্যাপ্ত পিপিই দিয়েছে। আর সমস্যা হবে না।’
সরকার তো সরকারি হাসপাতালে দিয়েছে-বেসরকারি পর্যায়ের জন্য কী উদ্যোগ আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেসব হাসপাতাল ব্যবসা করছে, তারা নিজদের উদ্যোগেই সংগ্রহ করবে। আর সরকারি পর্যায়ে সরকার দিয়েছে। এরপরও যদি বেসরকারি পর্যায়ে প্রয়োজন হয় এবং তারা যদি সরকারের নজরে আনে, তাহলে নিশ্চয়ই সরকার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু কোনোভাবেই চিকিৎসা বন্ধ রাখা যাবে না। কারণ, চিকিৎসকেরা রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েই এই মহান পেশায় এসেছেন।’






প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
25380 জন