ত্রাণের অপেক্ষায় নিম্নবিত্তরা : চট্টগ্রামে সংঘর্ষ
আব্বা চাল আনলে খামু
Published : Friday, 3 April, 2020 at 12:00 AM, Update: 02.04.2020 10:32:19 PM
আব্বা চাল আনলে খামুদিনকাল রিপোর্ট
সময়টা বড্ড খারাপ যাচ্ছে মরিয়ম বেগমের। হাঁটুর ব্যথায় কাবু। বয়স প্রায় ৮০। সকালে একবার ভাত জুটেছে। খেয়েছেন পাতলা ডাল দিয়ে। রাতে কি খাবে জানা নেই পরিবারটির। এই বৃদ্ধা থাকেন বড় ছেলের সাথে। ছেলে পণ্য আনা নেয়ার ভ্যান চালায়। এখন কাজ বন্ধ। ছেলের নাম আফজাল হোসেন।
তিনি জানান, প্রায় সপ্তাহ খানেক থেকে আয় বন্ধ। একটা রড সিমেন্টের দোকানের পণ্য আনা নেয়া করে চলে তার সংসার। তিনি বলেন, মাওটা বাড়িত বসি। রাইতে কি খাবার দেব তাও জানি না।
আফজালের স্ত্রী ২টি বাসা ও ১টি ছাত্রাবাসে কাজ করেন। এখন সব কাজ বন্ধ। তিনি বলেন, সবাই কাজ বন্ধ করি দিলো। মাসের শ্যাষের দিক চলি গেলো সবাই। অল্প কয়টা পয়সা দিয়াও তো যাবার পারিল হয়। এই দম্পতির ৩ মেয়ে ১ ছেলে। ৩ মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলে অন্যত্র থাকেন বাবা মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখেন না। তারা জানান, সূর্য ওঠার পর থেকে সাহায্যের জন্য ঘুরে বেরিয়েছেন। কিন্তু কিছুই জোটেনি কপালে। জমানো যা টাকা ছিল শেষ। ধার করবার মতোও কাউকে পাচ্ছেন না। তারা থাকেন মিরপুর ২ মোল্লাপাড়ায়। আজ মিরপুর ১ নম্ব^রে সাহায্যের জন্য দীর্ঘ সময় অপো করেছেন। অনেকে সাহায্যও পেয়েছেন কিন্তু ভিড় ঢেলে সেই সাহায্য তাদের হাতে পৌঁছায়নি।
আফজাল হোসেন বলেন, এমনে অভাবের সংসার তার ওপর কাম নাই কোন। করমোটা কী? ভিা করা ছাড়া উপায় কী?
তাদের পাশের বাসায় থাকেন ইউনুস মিয়া। ছোট্ট মেয়ে আয়েশাকে রেখে গেছেন চালের সন্ধানে। সাথে গেছেন তার মা। আয়েশা জানায়, কাল রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। এরপর অনেক রাতে তার মা খিচুড়ি রান্না করে। সকালের দিকে সেই বেচে যাওয়া খিচুড়িই খায় সে। সে বলে, অল্প একটু খিচুড়ি ছিল। আম্মা আমাক খাওয়াইছে নিজে খায় নাই। আমি কইলাম আম্মা খাও, কও তুই খা মা।
জানা যায়, তার বাবা চটপটির দোকানে কাজ করতেন। এখন দোকান বন্ধ।  আয়টাও বন্ধ। বাড়িতে কোন চাল ডাল কিছুই নেই। অল্প কয়টা মুড়ি ছিলো তা খেয়েই আয়েশার বাবা মা সাহায্যের আশায় বেরিয়েছেন। সাহায্য মিললেই জুটবে অভুক্ত পরিবারটির রাতের খাবার। আয়েশা আরও বলে, আব্বা চাল আনলে খামু।
দেশজুড়ে সাধারণ ছুটি, অফিস আদালত দোকানপাট, হাট-বাজার সব বন্ধ। যানবাহনের চলাচল নেই বললেই চলে। লোকজনের চলাচল নেই বললেও কিছু কিছু স্থানে জটলা দেখা যাচ্ছে। আর সেই জটলা দিনমজুর অসহায় দরিদ্র মানুষের। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এমনি দৃশ্য। রাজধানীর মহাখালী ফাইওভারের নিচে গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দেখা গেছে কয়েকশ নারী শিশু ও পুরুষ ত্রাণের অপোয় গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে বলেন আমাদের ঘরে খাবার নেই। আমরা খাদ্যের জন্যে দাঁড়িয়েছি। কেউ যদি খাদ্য বিতরণ করে এ অপোয় আছি। তাদের করোনা ভাইরাস নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বলেন আগে খাবার দিন। আমরাতো না খেয়ে মরে যাব। করোনার কারণে সব বন্ধ কাজ নেই, আমাদের ঘরে খাবারও নেই। শুধু খাবারের জন্য বাইরে আসছি।
এমনিভাবে খাদ্যের সন্ধানে এসব মানুষই ভিড় করছেন সড়ক মহাসড়কসহ আশেপাশে। গতকাল রাজধানীর কল্যাণপুর বস্তিতে গেলে দেখা যায় একই চিত্র। গণমাধ্যমের কর্মীদের দেখে ত্রাণ আসছে ভেবে দৌড়ে আসে শতাধিক মানুষ। এ সময় তারা জানায় এখন পর্যন্ত তারা কোনো ত্রাণ পায়নি। স্থানীয় কাউন্সিলর কয়েকদিন আগে তালিকা করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো খবর নেই। বস্তির বাসিন্দা এমারত জানান এই বস্তিতে প্রায় ৩০-৩২ হাজার লোক বসবাস করেন। এদের বেশিরভাগ মানুষের বাসা বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। দেশে করোনা ভাইরাসের উপসর্গ আসার পর থেকে তাদের বাসা বাড়িতে কাজ করতে দেয়া হয় না। আবার তাদের বেতনও পাচ্ছে না ফলে তাদেরকে এখন কষ্টে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। অনেকের ঘরে এখন খাবার নেই। কারও গরে কিছু খাবার থাকলেও তা শেষ হবার পথে। বস্তির সখিনা খাতুন জানান আমরা গরিব মানুষ। কাজ নেই, খবার নেই। এবাবে কিভাবে বাচুম বাবা।
রাজধানীর তেজগাঁও বস্তির লোকজনদের বিজয় স্মরণির ফাইওভারের উপরে, দু পাশে ব্যাগ নিয়ে পাঁচ-ছয়জন করে একসাথে জটলা বেধে ঘুরতে দেখা গেছে। ফাইওভারের পশ্চিমপাশে বিজয় স্মরনির মাথায় একজন মহিলাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমারা পাশের বস্তিতে তাকি। ঘরে খাবার নেই। তাই রাস্তায় আসছি দেখি কিচু পাওয়া যায় কিনা। তিব্বত মোড়ে দেখা যায় ৪-৫ জন মহিলা একইভাবে দাঁড়িয়ে আছেন ত্রাণের অপেক্ষায়।
এদিকে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অবস্থাও খারাপের দিকে। করোনার কারণে সাধারণ ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় তারাও পড়ছেন খারাপ অবস্থায়। তাদের অবস্থা এমন যে, তারা না রাস্তায় দাঁড়াতে পারছেন না নিতে পারছেন অনুদান। রাজধানীর বিভিন্নস্থানে সরকারি ন্যায্যমূল্যে চাল, ডাল, তেল, চিনি ও পেঁয়াজ বিক্রির জন্য দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন। দীর্ঘ লাইন ধরে মানুষকে নিত্যপণ্য কিনতে দেখা গেছে। এদিকে সরকারিভাবে ১০ টাকা কেজি ধরে চাল বিক্রির ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
এদিকে খাদ্য সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন জেলার নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষেরা। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষদের জন্য জরুরিভিত্তিতে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছানো না গেলে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেনাবাহিনী টহল শুরু করার পর মানুষজন সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চললেও হাট-বাজার ও সড়ক-মহাসড়কে মানুষজনের জটলা বেড়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের গাড়ি দেখে লোকজন সরে গেলেও পরে আবারও ভিড় করছেন সেখানে। ত্রাণ সহায়তার জন্য পথে পথে ঘুরা এসব মানুষ খাদ্য সামগ্রীর সহযোগিতার জন্য কড়া রোদে অপো করছেন।
চট্টগ্রামে ত্রাণ না পেয়ে বিােভ : চট্টগ্রামে ত্র্রাণ না পেয়ে বিােভ করেছে একদল দুস্থ মানুষ। তাদের অভিযোগ ত্রাণ দেয়ার খবর দিয়ে এনে তাদের ত্রাণ দেয়া হয়নি। এ কারণে তারা ুব্ধ হয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্দর থানার সামনে এ বিােভ প্রদর্শন করা হয়। এর আগে নগরীর খুলশী থানার জিইসির মোড় এলাকায় বাটা গলির সামনেও সড়ক অবরোধ করে ত্রাণের জন্য বিােভ করেন দুঃস্থ লোকজন।
বিােভের বিষয়টি স্বীকার করে বন্দর থানার ওসি সুকান্ত চক্রবর্তী বলেন, সিএমপি কমিশনারের উদ্যোগে দুঃস্থ মানুষদের খাদ্য সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নগর পুলিশের বন্দর বিভাগের চারটি থানা এলাকায় তিন হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় উদ্বোধন করেন নগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান।  কমিশনার স্যার উদ্বোধন করে চলে যাওয়ার পর কিছু লোক আকস্মিকভাবে থানা কমপাউন্ডে জড়ো হন। তারা ত্রাণ সামগ্রী পাওয়ার আশ্বাস পেয়ে এখানে এসেছে, এমনটা জানান। কিন্তু এসব সহায়তা রাতের অন্ধকারে দুঃস্থ মানুষের বাসায় গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসার কথা। তাই থানা থেকে খাদ্য সহায়তা বিতরণের কোনো সিদ্ধান্ত পুলিশের ছিল না। এরপরও যারা চলে এসেছেন তাদের বুঝিয়ে থানা কমপাউন্ড থেকে বের করে দেয়া হয়। পরে দুপুর ২টারি দকে এ নিয়ে বিােভ করেছে তারা।




নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (বন্দর) আরেফিন জুয়েল বলেন, মানুষ আসলে খাদ্যের কষ্টে পড়েছে। বিষয়টি মানবিক। সেটা ভেবে পুলিশ রাতে মানুষের বাড়িয়ে গিয়ে পর্যায়ক্রমে এসব সামগ্রী পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিটি প্যাকেটে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ ও সাবান ইত্যাদি রয়েছে।
এর আগে নগরীর জিইসির মোড়ে আগে বাটা গলিতে ত্রাণ বিতরণ করা হয় আওয়ামী লীগ নেতা আরশেদুল আলম বাচ্চুর প।ে সেখানে শিা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান নওফেল উপস্থিত ছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর ত্রাণের জন্য বিােভ প্রদর্শন করেন দুঃস্থ মানুষেরা।






প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
25248 জন