খালেদা জিয়ার দণ্ড ৬ মাস স্থগিত
Published : Wednesday, 25 March, 2020 at 12:00 AM, Update: 24.03.2020 11:02:57 PM
রফিক মৃধা, দিনকাল
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাজা ৬ মাসের জন্য স্থগিত করে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টায় গুলশানের নিজ বাসায় জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ কথা জানান। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আইনি প্রক্রিয়াগুলো শেষ হলে আজ বুধবার দুপুরের মধ্যে তা শেষ হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহীদুজ্জামান। এদিকে বেগম খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম জানিয়েছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সাময়িক মুক্তি পেয়ে বাসভবন ফিরোজায় উঠবেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমার কাছে একটা দরখাস্ত করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার পরিবার নির্বাহী আদেশে তাঁকে মুক্তি দেয়ার জন্য। সেখানে অবশ্য তারা  বলেছিলেন লন্ডনে উন্নতর চিকিৎসার জন্য আবেদনটি করা হয়েছে। এরপরে বেগম খালেদা জিয়ার ভাই শামীম ইস্কান্দর, তার বোন সেলিমা ইসলাম এবং তার বোনের স্বামী রফিকুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই বিষয়ে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এবং সেখানেও এই আবেদনের বিষয়ে কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলেছিলেন নির্বাহী আদেশে তাঁকে মুক্তি দেয়ার জন্য। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তিনি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় উপধারা(১) বেগম খালেদা জিয়া যে সাজা সেটা ছয় মাসের জন্য স্থগিত রেখে তাঁকে ঢাকাস্থ নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করার শর্তে এবং ওই সময়ে তিনি দেশের বাইরে না যাওয়ার শর্তে মুক্তি দেয়ার জন্য আমি মতামত দিয়েছি। সেই মতামত এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণানয়ে পৌঁছে গেছে।  এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, কিছুক্ষণ আগে আমার মতামত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি এবং আমি আপনাদের এখানে উল্লেখ করেছি যে, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ হচ্ছে- আইনি প্রক্রিয়ায় এই দুই শর্তসাপেক্ষে তার দন্ডাদেশ স্থগিত রেখে তাঁকে মুক্তি দেয়ার জন্য। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, এখানে বলা হচ্ছে না যে, তিনি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারবেন না। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তির ব্যাপারে তাঁর কন্ডিশনের ওপরে দেখা যাবে, সেই জন্যই কথাটা উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাসায় থেকে তিনি চিকিৎসা গ্রহণ করবেন। বেগম খালেদা জিয়ার বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে সরকার সদয় হয়ে দন্ডাদেশ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে নেতাকর্মীদের যা বললেন মির্জা ফখরুল :
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শর্তসাপেক্ষে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিএনপি নেবে কিনা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে বলবেন বলে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল সোয়া ৫টার দিকে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ প্রতিক্রিয়া দেন।
তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তটা ভালোভাবে দেখতে হবে। শর্তসাপেক্ষে মুক্তির সিদ্ধান্ত বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা যায় কিনা- আলোচনা করে বলতে পারব। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, নেতাকর্মীদের বলব আপনারা শান্ত থাকবেন। স্বাস্থ্যের দিকে যতœবান হবেন।
এদিকে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি হচ্ছে- এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পরপর দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির কোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, জাসাসের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন রোকনসহ হাজারো নেতাকর্মী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের সামনে চলে যান।
বিএসএমএমইউ (পিজি) হাসপাতালের সামনে জমায়েত না হওয়ার র্নিদেশ : বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়,  এই মর্মে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির পক্ষ থেকে নির্দেশ প্রদান করা যাচ্ছে যে, বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যেন বিএসএমএমইউ (পিজি) হাসপাতালের সামনে ও গেটের ভেতরে জমায়েত না হন, এই জমায়েতের কারণে চলমান করোনা ভাইরাস মহামারির ভয়াবহ বিপর্যয়ের সময়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা এবং জমায়েত হওয়া দলীয় নেতাকর্মীরা উচ্চ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাই সকল নেতাকর্মীকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনা এবং করোনা ভাইরাসের মরণ ছোবল থেকে দেশবাসীসহ বিশ^বাসীকে রক্ষার করতে মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট দোয়া করার জন্য অনুরোধ জানানো হলো।  
বন্দি জীবনের অবসান হচ্ছে খালেদা জিয়ার : দুই বছরের বেশি সময় পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা বিচারাধীন থাকলেও কারামুক্তিতে বাধা ছিল জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা। সর্বশেষ গত ১২ ডিসেম্বর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বেগম খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন পর্যবেক্ষণসহ খারিজ করে দেন সর্বোচ্চ আদালত। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সম্প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে।
আজ মুক্তি পেতে পারেন খালেদা জিয়া :  বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়ার সুপারিশ করেছে সরকার। এখন আইনি প্রক্রিয়াগুলো শেষ হলেই মুক্তি পাবেন বেগম খালেদা জিয়া। এরমধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির সুপারিশের ফাইলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে। তবে আইনি প্রক্রিয়াগুলো আজ শেষ না হলেও আগামীকাল দুপুরের মধ্যে তা শেষ হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহীদুজ্জামান।
তিনি বলেন, আশা করি আগামীকালের (বুধবার) মধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শেষ করা যাবে। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কি জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহীদুজ্জামান গতকাল মঙ্গলবার বিকালে বলেন, এরই মধ্যে আমরা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ফাইল হাতে পেয়েছি। এখন আমরা এ বিষয়ে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করবো। মন্ত্রীর অনুমোদনের পর সেই ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদনের পর তাঁকে মুক্তি দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এরপরই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন। মঙ্গলবারের মধ্যেই বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন কিনা জানতে চাইলে শহীদুজ্জামান বলেন, মুক্তির ফাইলের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা আজ সম্ভব হবে না। তবে আশা করি আগামীকালের (বুধবার) মধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শেষ করা যাবে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সরকারের নির্বাহী আদেশে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যবস্থা করার বিষয়টি কারারক্ষীদের মাধ্যমে ইতিমধ্যে তাঁকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে।
খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গতকাল মঙ্গলবার টুইটারে দেয়া এক পোস্টে এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সাউথ এশিয়া। টুইটে বলা হয়, আমরা মানবিক কারণে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে কারামুক্তি দেয়ার বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। যেহেতু তিনি এমন অসুস্থতায় ভুগছেন যা তাঁর জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে, তাই তাঁকে অবশ্যই প্রয়োজনীয় অবাধ স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে।




খালেদা জিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার মানবিকতার নিদর্শন বললেন আ.লীগ নেতারা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার সুপারিশকে স্বাগত জানিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। তারা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিকতার নিদর্শন। এটি সময়োপযোগী এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর মানবিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে তিনি প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় দিয়েছেন। আশা করি বিএনপি নেতারা প্রধানমন্ত্রীর এমন উদার গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে ইতিবাচক রাজনীতি করবেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এটি খুব ভালো সিদ্ধান্ত। বেগম খালেদা জিয়ার পরিবার আগেই তাঁর মুক্তির আবেদন করেছিল। তাঁর বয়স, শারীরিক অবস্থা, সংকটময় সময় সবকিছু বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী তার নির্বাহী আদেশ দিয়েছেন। আমি এ সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানাই। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, আমরা চাই বেগম খালেদা জিয়া ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। দেশে করোনা ভাইরাসের কারণে একটি সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার বয়সসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাস্তববাদী ও মানবিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাঁকে মুক্তির সুপারিশ করেছেন। এটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালেরে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই মামলায় ১৭ বছর সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এরই মধ্যে তাঁর কারাজীবনের দুই বছর কেটে গেছে। কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ায় গত বছরের ১ এপ্রিল তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করা হয়। এখনও তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কথা বিবেচনায় নিয়ে তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যেতে আবেদন করেছেন তাঁর পরিবার। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত এল।






প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
25104 জন